
বালক বেলার প্রেম!
রকিবুল ইসলাম
আমি তখন সবে প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।সময়টা ১৯৯৬ সাল হবে। আমার বিদ্যালয়ের নাম ছিল ক্রিসেন্ট প্রি-ক্যাডেট নার্সারি স্কুল। সহপাঠী হিসাবে পেয়েছিলাম বাবু,মিন্টু,শরিফুল,সোহাগ,
রিয়াদ প্রমূখকে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করা আমি অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে সহজ হতে পারছিলাম না।অন্য ভাবে বলতে গেলে বলতে হয় তারাও ঠিক সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি আমাকে।ষষ্ঠ শ্রেণীর প্রথম সাময়িকী পরীক্ষায় আমি তিনটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে সকলের হাস্য-রসের খোরাক হয়েছিলাম। পরবর্তীতে অবশ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাগণের অকৃপণ সহযোগিতা, সহমর্মিতায় লেখা পড়ায় সফল হতে শুরু করি। ধীরে ধীরে সহপাঠীদের নিকটেও প্রিয়বৎসল হয়ে উঠতে লাগলাম।এরপর দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম কোন মতে।অবশ্য বাৎসরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হয়ে।সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে তানিয়া নাম্নী এক সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের প্রেমে পতিত হই। ভাল লাগত তাকে।ভালবাসতামও তাকে। তানিয়ার বড় বোন রেবেকা ম্যাডাম আমাদের বিদ্যালয়েরই শিক্ষিকা ছিলেন।
বালক বেলায় কি কেউ প্রেমে মত্ত হয়!ভাসে না কি কেউ পিরিতের জলে?আপনারা কি বলেন?আপনারা যদি আমাকে এক্ষেত্রে অকাল পক্ব বলেন তবে আমি তাই।হব না ই বা কেন!ঐ অতটুকু বয়স থেকেই যে বড় বড়, ভাই-বোনদের প্রেমের চিঠি বিলি করতাম!তার জন্য অন্য সব বড় ভাইদের চোখ রাঙানিও সইতে হয়েছে আমার।যাইহোক,আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি তানিয়া তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী।ভালবাসি তোমাকে -এ- কথা কখনোই বলা হয়নি তাকে। তবে,সে আমার চলন বলন দেখে ঠিকই বুঝতে পারত!আর তাছাড়া শরিফুল, সোহাগরা বলেছিল তারে।টিফিনে আমরা একসাথে আইসক্রিম,বাদাম,চটপটি খেতাম। কখনও শরিফুল, কখনও আমি, কখনও সোহাগ , মিন্টু বা বাবু খাওয়াতো। এদিকে শরিফুল ভালবাসত ও পঞ্চম শ্রেণীর শাহনাজ কে।সোহাগ ভালবাসত বি,এ ডিসি থেকে আসা- একজনকে (নামটা ভুলে গেছি)! একসাথে খেলতাম, একসাথে গাইতাম সকলে।ব্যপারটি সবার মাঝে প্রকাশিত হয়ে পড়ে সেদিন যেদিন একটি অনুষ্ঠানের জন্য শ্রেণীকক্ষ সাজানোর সময় একটি লাল ফ্লাগ আমি তানিয়ার পিঠে লাগিয়ে দিই।মৃদু আপত্তি করেছিল তানিয়া। ভেবেছিলাম ও বুঝি তাই চায় আমি যা চাই।অবশ্য সহপাঠীদের আনন্দের সীমা ছিল না।আমরা তখন সবাই সবার প্রিয় মানুষদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম।ভালোই যাচ্ছিল কেঁটে দিনগুলো। দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষায় শরিফুল প্রথম এবং আমি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি।আমার তানিয়া পঞ্চম শ্রেণীতে ভাল রেজাল্ট করে, কিন্তু, শরিফুলের শাহনাজ ডাব্বা খায়।এই নিয়ে আমাদের মাঝে হর্ষ-বেদনা দুটোই তৈরি হয়।হামিদপুর বাওড়ে বেড়াতে যেতাম প্রায়ই।কি যে মধূর ছিল সে দিনগুলো!এরপর বার্ষিক পরীক্ষা চলে এল।আমরা সকলেই সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হলাম। কিন্তু, আনন্দের আতিশয্যে ভেসে যাওয়ার পরিবর্তে দু:খকে বরণ করতে হলো। আমাদের বিদ্যালয়টি সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত ছিল।কাজেই,অষ্টম শ্রেণীর জন্য অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। সেই আলাদা হওয়া।এরপর অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে এখনও যোগাযোগ থাকলেও তানিয়ার সাথে আমার আর কখনোই দেখা হয়নি।
জানিনা, আজ কেমন আছে সে!আমার কথা তার আজ মনে পড়ে কি না! কিন্তু, আমার হৃদয় গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া সেই ভালবাসা এখনও অটুট!এ যে জীবনের প্রথম প্রভাতী প্রেম! এ যে অব্যক্ত,মানস মাঝারে লুকিয়ে রাখা অপরিণত অথচ নির্ভেজাল ভালবাসা! এ যে বালক বেলার অবাধ্য প্রেম, নির্ভেজাল ভালবাসা।
Leave a Reply