প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকে। এগুলোকে মূলত পারিবারিক, বিদ্যালয় কেন্দ্রিক এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. পারিবারিক ও সামাজিক কারণ
অভিভাবকদের অসচেতনতা ও শিক্ষার অভাব: অনেক পরিবারে বাবা-মা নিজেরা শিক্ষিত না হওয়ার কারণে বা সচেতনতার অভাবে সন্তানদের পড়াশোনার নিয়মিত খোঁজখবর নিতে পারেন না। বাড়িতে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশের ঘাটতি এর অন্যতম বড় কারণ।
অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা: দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অনেক সময় প্রয়োজনীয় খাতা, কলম, প্রাইভেট টিউটর বা পুষ্টিকর খাবারের অভাবের মুখোমুখি হয়, যা তাদের শিখনে বাধা সৃষ্টি করে।
পারিবারিক অশান্তি: পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ বা অশান্ত পরিবেশ শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা তাকে পড়াশোনায় অমনোযোগী করে তোলে।
২. বিদ্যালয় কেন্দ্রিক কারণ
অনুপযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত: ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শিক্ষকের তুলনায় অনেক বেশি হলে শিক্ষকের পক্ষে প্রতিটি শিশুর দিকে আলাদাভাবে নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে পিছিয়ে পড়া শিশুরা আরও পিছিয়ে পড়ে।
আনন্দহীন শিক্ষণ পদ্ধতি: পড়াশোনা যদি কেবল মুখস্থ-নির্ভর এবং একঘেয়ে হয়, তবে শিশুরা পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আধুনিক ও খেলাধুলার ছলে শেখানোর পদ্ধতির অভাব শিখন ঘাটতি তৈরি করে।
নিয়মিত মূল্যায়নের অভাব: শিশুরা কোন অংশটি বুঝতে পারছে না, তা যদি সময়মতো দুর্বলতা চিহ্নিত (Diagnostic Evaluation) করে দূর করা না হয়, তবে সেই ঘাটতি পরবর্তীতে আরও বড় আকার ধারণ করে।
৩. শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ
নিয়মিত উপস্থিতির অভাব: অসুস্থতা, পারিবারিক সমস্যা বা উৎসবের কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে আগের পড়া ও পরের পড়ার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ভয় ও আত্মবিশ্বাসের অভাব: কোনো নির্দিষ্ট বিষয় (যেমন: গণিত বা ইংরেজি) একবার কঠিন মনে হলে অনেক শিশু তা নিয়ে মনে ভয় তৈরি করে। শিক্ষকের অতিরিক্ত শাসন বা বকাঝকার ভয়েও অনেকে পড়া বুঝতে না পারলেও প্রশ্ন করে না।
বিশেষ শিখন চাহিদা কিছু শিশুর মধ্যে জন্মগতভাবেই পড়া বা গণিতে প্রতি বিশেষ সমস্যা থাকতে পারে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না কিন্তু শিখন ঘাটতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মূল কথা: প্রাথমিক স্তরের শিখন ঘাটতি দূর করতে শুধু বিদ্যালয় নয়, শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।