এস এম শাহনূর রচিত চব্বিশ বিপ্লবের একগুচ্ছ কবিতা
🔻শহিদি ঘ্রাণ বুকচেতিয়ে দেয় প্রাণ
কেমন করে জানল সাঈদ
বৃথা যায়না রক্ত
দ্রোহের বারুদ ফাটিয়ে দিল
দুপুর বেলার অক্ত।
পথেপথে জীবন থামে
মিছিল থামায় সাধ্য কার?
বজ্রমুঠি উঁচিয়ে বলে,
সবাই না-কি রাজা'কার।
লাখো মায়ের ভালোবাসা
হাজার ভাইয়ের বলিদান
ঘোর কুপোকাত স্বৈরশাসক
প্রাসাদপুরী খানখান।
🔻পরিবর্তনের ডাক
মূক বধির সমাজের চাবি আপনার হাতে
একটু ঘুরালে ফল পাবেন ভাই হাতেনাতে।
আপনি সাধু হলে চোর দমনে এগিয়ে আসুন
আপনি সৎ হলে অসৎ-কে বিতাড়িত করুন
আপনি হালাল খেলে হারামের বানিজ্য ছাড়ুন
আপনি দালিলিক হলে দখলদার উৎখাত করুন
আপনি পুরুষ হলে পতিতালয় ভেঙে ফেলুন
আপনি আমলা হলে দ্রুত ফাইল ছাড়ুন
আপনি নেশাগ্রস্ত হলে মাদক-কে না বলুন
আপনি শিক্ষক হলে আদর্শিক শিক্ষা দিন
আপনি বণিক হলে সিন্ডিকেট ভেঙে দিন
আপনি নেতা হলে সুনীতি লালন করুন
আপনি জনতা হলে দুঃশাসনে বিদ্রোহী হোন
আপনি আইনজীবী হলে ছ্যাবলামি ছাড়ুন
আপনি বিচারপতি হলে তুলাদণ্ডে মাপুন
আপনি পুলিশ হলে বিনাঘুসে সেবা দিন
আপনি ইমাম হলে কুরআনিক সবক দিন
আপনি কবি হলে সত্যবাণী ছড়িয়ে দিন
কৃষক শ্রমিক কামার কুমার তাতী জেলে
দোষ না খুঁজি এঁদের- এঁরা মাটির ছেলে
জাগতিক কিছু পরিবর্তন আপনার হাতে
যেমনঃ আল্লাহর হাতে রয়েছে রাত্রি দিন।
🔻জাগো
নির্ঘুম চোখ ভরা স্বরনদ্বীপের স্বপ্নে
জীবন সাগরে ঝড়ে পরা এক তরী,
দৈনিক শতবার ডুবি শতবার বাঁচি
ষড় রিপুর যাঁতাকলে শতবার হারি।
মাঠে ঘাটে রাজপথে মানবতার গান,
সম্প্রীতির বাংলায় ঝরেনা যেন প্রাণ।
গাণিতিক বিচারে নগণ্য হয় বিপ্লবী
কিছু হয় ত্যাগী, অধিকাংশ ভোগী।
সংখ্যায় অধিক সুবিধাভোগী,
অর্ধাহারে কাটছে যারা ত্যাগী।
হে কান্ডারী হুঁশিয়ার;
একমুহূর্ত গাফেল হলে
গর্জে ওঠবে স্বৈরাচার।
হে ছাত্র-জনতা হুঁশিয়ার;
একমুহূর্ত গাফেল হলে
ডুবে যাবে পারাপার।
🔻মুখোশ
হে পূজারী দেবীর কী দোষ?
মুখশ্রী হেরি টালমাটাল তুমি
দেখনি তার নকল মুখোশ।
বহুকাল গোঁফে মেখে তেল
রুক্ষ মাথায় ভেঙ্গেছে বেল!
রুই কাতলাদের পুকুর চুরি
আমজনতা কইতে না পারি।
হিসাব নিতে হাত-পা বান্দে
ফান্দে পড়িয়া বকা কান্দে!
মানুষের চরিত্র পাল্টে গেছে
যেমন পরিবর্তন হয় রাত্রি-দিন;
আপনি কাউকে মূল্যবান ভাবলে,
আপনাকে ভাবছে মূল্যহীন!
পাক পিরিতির পরিনতি
হ্রাস করবে স্বদেশপ্রীতি।
বড় প্রেম কাছে টানে
তিনি এখন সেখানেই
আছেন প্রেমের টানে!
🔻গণ-আত্মার অণু কবিতা
★দেশপ্রেমিক
তোমাকে বেল তলায় দেখিনা
দেখিনা ভুতুড়ে বটতলায়।
রসবতী খেজুর-আম্রপালি তলে
অনায়াসে পাওয়া যায়!
★হাততালি
হলভরা দর্শকপ্রিয় বাচিক তুমি
কখনো কবিতার সমঝদার,
আজ ভক্তের থুথুতে ডুবন্ত তুমি!
হাততালি চাও নাকি আর?
★বিপ্লব ২০২৪
বারুদের গন্ধে ঘুমিয়ে পড়া তিলোত্তমা নগরী
নবকিশলয়ের মত জেগে উঠছে সে মৃত্যুপুরী।
৫২, ৬৯,৭১ রে কী ঘটেছিলো দেখেনি দুচোখ
‘২৪ ইতিহাসে হবে হাসিমাখা বিবর্ণ এক মুখ।
★জেন- জি
তার চলার পথ বলো কে রুখিতে পারে?
কোন শব্দটা বুলেট, কোনটা টিয়ার শেল
আর কোনটা কানফাটানো সাউন্ড গ্রেনেড!
যে নির্ভীক অনায়াসে বলে দিতে পারে।
🔻পানি যুদ্ধ
বিশ্ব দেখেছে অস্ত্র ছাড়া এক যুদ্ধ
রিক্ত হাতে বিজয়ীবীর শহিদ মুগ্ধ।
“ভাই পানি লাগবে কারও, পানি”
হাজারো পাষাণ হ্নদয়গলা বাণী।
ঘৃণার বারুদের গন্ধে টুটে যত ফাঁদ
স্লোগানে কাঁপে স্বৈরাচারীর প্রাসাদ।
অধিকার সংগ্রামের পথে পথে পানি
মনে পড়ে কারবালার ফুরাত কাহিনি।
মারণাস্ত্র ছাড়াও যুদ্ধ হয় নহে সংশয়
জালেমের জুলুম মনে জাগায় ভয়।
শেষ ফল জানা ‘গণিতজ্ঞ মুগ্ধ’ বলে
রাজপথে বুকের রক্ত দিলো ঢেলে!
যমজ স্নিগ্ধ স্বপ্ন আঁকে আখি জলে
অতিথিপরায়ণ তিতাস পাড়ের ছেলে।
🔻তারুণ্য
প্রেম প্রণয়েও নেই তরুণ
কৃষক নেই জমিন চাষে,
শ্রমিক ব্যস্ত মিছিল-সভায়
দেশ চলছে অটোপাসে!
সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরা
সেই সুবোধ বালক কই?
পড়ার টেবিল উবে গেছে
আর পড়ে না কেউ বই।
নেতার ছেলে নেতা হচ্ছে
আমলার ছেলে আমলা,
আমলা-নেতা বাদ দিলে
সবার সন্তানই কামলা!
🔻স্বপ্নচারী কলম সৈনিক
সেদিনও ফাগুন মনে আগুন ছিলো
বুক পকেটে বৃষ্টিস্নাত গোলাপ ছিলো
মুক্তির কথা বলতে এলেও গুলন্দাজ পেটোয়া ছিল
ডর ভয় হীন কণ্ঠজুড়ে, নয়া জমানার ফরমান ছিল
দৃঢ় প্রতিবাদী ছাত্র জনতার মিছিল ছিল
রাজপথে বিক্ষুব্ধ কবি-লেখক সমাজ ছিল
শাসক যখন শোষক সুশাসনের দুয়ার যখন রুদ্ধ
নিভৃত স্বপ্নচারী কলম সৈনিকও হয়ে ওঠে বিক্ষুব্ধ।
🔻৩৬ জুলাই
সেদিন আগুনের রোদ জাগিয়েছিল বোধ
বুক চেতিয়ে দাঁড়ায় শত প্রজন্মের ক্রোধ।
সেদিন চৌকাঠ পেরিয়ে ৫ আগস্ট আসে,
তবু সেদিনের নাম বিপ্লবী কণ্ঠে হয়নি ঠাই
"যতদিন দাবি পূরণ না হয়, আগস্ট নয়"
প্রমী বুকের খাতায় সেদিনও ৩৬ জুলাই।
দুঃশাসনের পতনে ফিকে ক্ষমতার রূপ
রক্তে রাঙা রাজপথে জয়ধ্বনি অপরূপ।
সেদিন ফুটেছিল চোখে তারুণ্যের সূর্য,
শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত প্রান্ত-দেশ
বারুদের গন্ধে, দাবানলে জেগে উঠে
গর্বিত চেহারার এক নতুন বাংলাদেশ।
🔻কে আসেনি, কে হাসেনি?
যারা দেশপ্রেমিক তারা এসেছিল।
মুটে-মজুর, কলকারখানার শ্রমিক
এসেছিল
মসজিদের মোয়াজ্জেম-ঈমাম
এসেছিল
সুন্নি-সিয়া, ইবতেদায়ী-কওমিরাও
এসেছিল
কৃষক-জেলে-সবজির আড়ৎদার
এসেছিল
মৌয়াল, দর্জি, স্বর্ণকার, কর্মকার
এসেছিল
মন্দিরের ঠাকুর-গীর্জার পুরোহিত
এসেছিল
কররস্থানের প্রহরী, মাজারের খাদেম
এসেছিল
দফাদার, তহশিলদার, পেশকার, নাজির
এসেছিল
বাবা মার হাত ধরে ছোট্ট শিশুরাও
এসেছিল
তৃতীয় প্রজন্মের হাত ধরে বুড়ো-বুড়ি
এসেছিল
হোটেল-ক্যান্টিনের সার্ভিস বয় সেও
এসেছিল
শিক্ষক, প্রশিক্ষক, প্রভাষক, নিরীক্ষক
এসেছিল
কবি-লেখক, শিল্পী, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী
এসেছিল
কাজী নজরুল-আল মাহমুদ-কবি সুকান্ত
এসেছিল
ঊনসত্তর-বায়ান্ন-একাত্তরের শহিদেরা
এসেছিল
ষোল কোটি ছাত্র-জনতা রক্তাক্ত রাজপথে
এসেছিল
মা দুধের শিশু রেখে, বাবা অফিস ফেলে
এসেছিল
বৃথা যায় না রক্ত; গ্রেনেড-বুলেটের উৎসবে
রক্তমাখা আবু সাঈদ-আনাস-মুগ্ধরা হেসেছিল।